রাষ্ট্রায়ত্ত লাভজনক কোম্পানি ও দেশে ব্যবসারত বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির জন্য দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করে যাচ্ছে সরকার। তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, পুঁজিবাজারে দুরবস্থা ও কোম্পানিগুলোর অনাগ্রহের কারণে এ উদ্যোগ সফল হয়নি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রায়ত্ত ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্তির জন্য নতুন করে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যদিও দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে পুঁজিবাজারে নতুন কোনো কোম্পানি আসেনি। এ অবস্থায় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বহুজাতিক কোম্পানির তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া শুরু করতে চাইছে সরকার। গতকাল অর্থ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চ পর্যায়ের সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
সভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান, বাণিজ্য, বস্ত্র ও পাট এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন, শিল্প, গৃহায়ন ও গণপূর্ত এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (অর্থ মন্ত্রণালয়) ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
তাছাড়া সভায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক, বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ফারহানা মমতাজ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমান, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ এবং ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবু আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।
উচ্চ পর্যায়ের এ সভায় রাষ্ট্রায়ত্ত ও বহুজাতিক ১০টি কোম্পানির পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। কোম্পানিগুলো হচ্ছে কর্ণফুলি গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি, কর্ণফুলি ফার্টিলাইজার কোম্পানি (কাফকো), নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি, সিনজেনটা বাংলাদেশ, সিলেট গ্যাস ফিল্ডস, ইউনিলিভার বাংলাদেশ, সিনোভিয়া বাংলাদেশ, নোভার্টিস (বাংলাদেশ) ও নেসলে বাংলাদেশ। সভায় এ কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরা পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তি বিষয়ে তাদের প্রস্তুতি ও অবস্থানের বিষয়টি তুলে ধরেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সভায় সরকারের দিক থেকে কোম্পানিগুলোকে দ্রুততার সঙ্গে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির বিষয়ে প্রস্তুতি সম্পন্ন করার তাগিদ দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে সরকার আগামী মাসের মধ্যে অন্তত এক-দুইটি কোম্পানি হলেও তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া শুরু করতে চায়। রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে তালিকাভুক্তির জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনসহ আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো জানিয়েছে তারা তালিকাভুক্ত হতে চাইলেও এক্ষেত্রে তাদের প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন। এমনকি বাংলাদেশ সরকারের কাছে থাকা এসব কোম্পানির শেয়ার যদি সরাসরি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে ছাড়তে চায়, তাহলেও প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন গ্রহণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কয়েকটি কোম্পানি তালিকাভুক্তির বিষয়ে প্রধান কার্যালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে, যদিও এখন পর্যন্ত এর অনুমোদন পাওয়া যায়নি বলে সভায় জানানো হয়েছে।
সভায় সরকারের পক্ষ থেকে তালিকাভুক্তির বিষয়ে প্রয়োজনে কঠোর হওয়ারও ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে কোম্পানিগুলোকে আইনিভাবে বাধ্য করার বিষয়টিও উঠে আসে। তবে সরকার চাইছে কোম্পানিগুলো যাতে স্বেচ্ছায় পুঁজিবাজারে আসে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত বছরের ১১ মে পুঁজিবাজারের উন্নয়নে পাঁচ দফা নির্দেশনা প্রদান করে সেগুলো বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছিলেন। এর মধ্যে পুঁজিবাজারে বহুজাতিক ও বেসরকারি খাতের স্থানীয় করপোরেট কোম্পানিগুলোর তালিকাভুক্তি অন্যতম। তার এ নির্দেশনার পর পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তি নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে বেশ কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।